মহান মে দিবস শপথ ভঙ্গে’র দিন

মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা: শ্রমিকের ঈদ আনন্দের চেয়েও বেশী খুশীর দিন মহান মে দিবস। দিবসটি ঘিরে শ্রমিকের প্রস্তুতি আর কর্মসূচীর শেষ নেই। নগরীজুরে পোষ্টার আর ব্যানারে ছেয়ে যাই। লাল পতাকা আর বুক ভাটা চিৎকার দিয়ে বৎসরের এই দিনটিতে সবাই রাজপথে নেমে আসে আর শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে দেয় আর বলে মহান মে দিবস সফল হোক-স্বার্থক হোক। একদিনের চিৎকারে ভুলে যাই বাকী ৩৬৪ দিনের কথা। ভুলে যাই বাকীদিন গুলো তাদের উপর কিভাবে নেমে আসে নির্যাতন নিপিড়ন আর সীমাহীন মালিক কর্তৃক বৈশম্যের কথা। প্রতিদিনই শ্রমিকরা নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। হোটেল শ্রমিক, ঘাট শ্রমিক, রিক্সা শ্রমিক, কুলি, দিন মজুরসহ সকল শ্রেণীর শ্রমিকদের নির্যাতনের করুণ চিত্র বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে উঠে আসলেও তার যেন কোন প্রতিকার নেই। হোটেল শ্রমিকদের নুন থেকে চুন খসলে প্রকাশ্যে ভোক্তাদের সামনে নির্যাতন করা হয়। প্রতিবাদ কেউ করে না, অবস্থা দেখে মনে হয় শ্রমিকদের উপর মালিক কিংবা মালিক পক্ষের নির্যাতন করাই একটি ‘অধিকার’। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশ নারী শ্রমিক। তারা শুধু বেতন বৈশম্যের শিকার হয় না নানাভাবে যৌন হয়রানীর শিকার হয়। মালিক পক্ষ অনেক সময় বেতনাদি পরিশোধ না করে ফ্যাক্টরী বন্ধ ঘোষণা করে তখন শ্রমিকরা নিরুপায় হয়ে শ্রমকি নেতা-নেত্রীদের কাছে গিয়ে কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ হয় না বরং সেখানেও তারা নতুনভাবে হয়রানীর শিকার হয়। চাকুরী বঞ্চিত শ্রমিকদেরকে নানাভাবে ব্যবহার করে এবং সেখানেও অনেক নারী শ্রমিক নেতার লালসার শিকার হতে হয়। লজ্জা, ভয়, কষ্ট, যন্ত্রনা আর দুঃখের কথা কারো সাথে শেয়ারও করে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানীতেও নারী শ্রমিকরা যেমন বেতন বৈশ্যের শিকার হয় তেমনি অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রহীন বসকে খুশী করতে না পারলে চাকুরীচুৎ হতে হয়। অনিশ্চয়তার জীবনের যন্ত্রনা সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেঁছে নেয়। এই তো রানা প্লাজার ধসের ৬ষ্ঠ বার্ষিকী দিনে রানা প্লাজার এক ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিক আত্মহত্যা করলো। কিন্তু শিশু শ্রম বন্ধ করার ঘোষণা থাকলেও প্রতি বছর শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে এবং তাদের উপর চলে সীমাহীন ভয়াবহ নির্যাতন। বায়ুপথে বাতাস দিয়ে রাজনের নিষ্ঠুর হত্যার কথা আমাদের মনে থাকলেও শিক্ষাগ্রহণ করিনি। প্রতিদিনই শ্রমিকরা নির্যাতিত হয়ে নিরব ও নিথর থাকে, কেউ প্রতিবাদটি করে না। অথচ মে দিবস আসলেও রাজপথে প্রকাশ করে ৩৬৪ দিনের জমে থাকা ক্ষোভ। আর সে কারণেই মে দিবসই হচ্ছে শপথ ভঙ্গের দিন। যদিও ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকেরা শ্রমের উপযুক্ত মূল্য এবং দৈনিক অনাধিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে অনেক শ্রমিক হতাহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে ধৈনিক কাজের সময় আট ঘন্টা করার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মহান মে দিবসের মাধ্যমে। ১৩৭তম দিবস পালিত হলেও কার্যত এখনও শ্রমিকরা নানা বৈশ্যমের শিকার। মে দিবস হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজন্ম লড়াইয়ের একটি ঐতিহাসিক দিন।
লেখক
মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
ই-মেইল: monzuesha78@gmail.com