ফের বরখাস্ত আরিফুল-বুলবুল

নিউজ ডেস্ক: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে ফের বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

প্রায় দুই বছর পর রোববার দায়িত্ব ফিরে পান আরিফুল ও বুলবুল। তবে দায়িত্ব নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের আবারও সাময়িক বরখাস্ত করা হল।

দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর এ দুই মেয়র আজ রোববার দায়িত্ব নিতে নিজ নিজ কার্যালয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বরখাস্তের চিঠি পাঠানো হয়।

দুই বছর তিন মাস পর রোববার সিসিক মেয়রের চেয়ারে বসেন আরিফুল হক চৌধুরী। রোববার সকাল ১১টা ১১ মিনিটে তিনি নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে পৌঁছান।

এসময় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন অ্যাক্ট উপ-সচিব মো. মাহমুদুল আলম কর্তৃক সিলেট সিটি কর্পোরেশনে একটি ফ্যাক্স বার্তা প্রেরণ করা হয়েছে।

ওই বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা-৪/২০০৯ এর সম্পূরক অভিযোগপত্র গত ২২ মার্চ আদালতে গৃহিত হয়েছে। সেহেতু সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্থানীয় সরকার বিভাগ আইন ২০০৯ এর ১২ উপধারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাময়িক বরখাস্ত করা হল।’

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব মেয়রকে বরাখাস্ত করার মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্স পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। ২০১৪ সালে তৃতীয় সম্পূরক চার্জশিটে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে আসামি করা হয়। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে গৃহীত হলে ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। আদালতের বিচারক মেয়র আরিফের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ওই বছরের ৭ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এক আদেশে সিসিক মেয়র আরিফকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। সম্প্রতি এই আদেশের বিরুদ্ধে মেয়র আরিফ রিট পিটিশন দায়ের করলে শুনানি শেষে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বাতিলের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সরকার পক্ষ আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে আরিফের মেয়র পদ ফিরে পাওয়ার সকল আইনী বাধা দূর হয়। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি দীর্ঘ কারাভোগের পর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান আরিফুল হক চৌধুরী। অপরদিকে, কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলার ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পর মেয়র আরিফকে শ্যোন এরেস্ট দেখানো হয়। অবশেষে এই মামলায় বরখাস্ত হলেন মেয়র আরিফ।

অন্যদিকে, দীর্ঘ ২৩ মাস পর আদালতের রায় পেয়ে রোববার নগর ভবনে যান রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তবে দায়িত্ব নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বুলবুলকে।

রোববার বেলা ৩টার দিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি ফ্যাক্স বার্তা এসেছে সিটি কর্পোরেশনে। এসময় মেয়র বুলবুল নগর ভবনে তার দফতরেই ছিলেন। নগরীর ২০১৫ সালের বোয়ালিয়া থানার একটি মামলায় বুলবুলের বিরুদ্ধে মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মুহম্মদ আনোয়ার পাশা স্বাক্ষরিত (স্মারক নং ৪৬.০০.০০০০.০৭১.২৭.০১৯.১৫.১৯৮) এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বুলবুলের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ায় সিটি কর্পোরেশন আইন-২০০৯ এর ১২ ধারার উপ-ধারা-১ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তবে এই আদেশকে কতিপয় কর্মকর্তার ‘ষড়যন্ত্র’ দাবি করে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল যুগান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আপিলের রায় নিয়ে আমি চেয়ারে বসেছি। কাজেই আমি এখন থেকে নিয়মিত অফিস করব। কাজ করবো। এছাড়া বিগত দুই বছরে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র, কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে, দিনভর নানা নাটকীয়তা শেষে বুলবুলকে ফের সাময়িক বরখাস্তের প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘আইনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আইন মেনেই মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্ত করেছে। এখানে কারো জোর জবরদস্তি করে ক্ষমতা ধরে রাখার কিছু নেই।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকাল ১০টার পর বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে নিয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল নগর ভবনে যান। নগর ভবনে ঢুকেই মেয়র বুলবুল তার দফতরে যান।

এ সময় কক্ষটি তালাবদ্ধ থাকায় তিনি পাশেই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে বসেন।

এ সময় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন উপস্থিত থাকলেও তিনি মেয়রের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে কোনো উদ্যোগ নেননি।

পরে মেয়র বুলবুল সাংবাদিকদের জানান, আদালতের রায় হাতে নিয়ে তিনি দায়িত্ব নিতে এসেছেন। কিন্তু এসে দেখেন তার কক্ষ তালাবদ্ধ।

এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের পরও আমাকে চেয়ারে বসতে দেয়া হচ্ছে না। স্বৈরাচারী কায়দায় একটি মহল গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করছে।

যারা মেয়রের দফতরে তালা ঝুলিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান বুলবুল। তিনি এটিকে আদালত অবমাননার শামিল বলেও মন্তব্য করেন।

এদিকে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাসিক’র সচিব খন্দকার মাহাবুবুর রহমান মেয়র বুলবুলকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। এ সময় বিএনপিপন্থী কাউন্সিলর ও দলীয় নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

Share This: