চাঞ্চল্যকর পাঠাও রাইড চালককে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ৩


লাইভ প্রেস২৪,ঢাকা: চাঞ্চল্যকর পাঠাও রাইড চালক মো: শামীম বেপারী ওরফে বাবু (২৮)কে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের ৩ সক্রিয় সদস্যকে রাজধানীর আশুলিয়ার কাঠগড়া পালোয়ান পাড়া এলাকা থেকে আটক করেছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১) উত্তরার একটি দল।

আটককৃতরা হলেন- (০১) মোঃ মামুনুর রশিদ (২২), পিতা- মোঃ আব্দুল কাদের, মাতা- সুফিয়া বেগম, সাং- জোড়বাড়িয়া কালাকান্দা, পোষ্ট- ফুল বাডিয়া, থানা- ফুলবাড়িয়া, জেলা- ময়মনসিংহ, বর্তমানে সাং- জামগড়া, সর্দার মার্কেট, নাঈম মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া, থানা- আশুলিয়া, ডিএমপি, ঢাকা, ২) মোঃ মাহবুবুর রহমান (২০), পিতা- মৃত সিদ্দিক মুন্সি, মাতা- বিবি মরিয়ম, সাং- চরটিটিয়া, পোষ্ট- তালুকদার বাড়ি, থানা- বোরহানউদ্দিন, জেলা- ভোলা, বর্তমানে সাং- জামগড়া, রুপায়ন মাঠ, হাসেম মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া, থানা- আশুলিয়া, ডিএমপি, ঢাকা এবং ৩) মোঃ মোমিন মিয়া (২০), পিতা- মৃত আছর উদ্দিন, মাতা- মমেনা বেগম, সাং-কুলাঘাট, পোষ্ট- শিবের কুঠি, থানা- লালমনিরহাট সদর, জেলা- লালমনিরহাট, বর্তমানে সাং- জামগড়া, রুপায়ন মাঠ, রানা মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া, থানা- আশুলিয়া, ডিএমপি, ঢাকা।

এসময় র‌্যাব সদস্যরা তাদের নিকট থেকে ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং হত্যাকারীর রক্তমাখা প্যান্ট সহ মোট ৫টি মোবাইল ফোস উদ্ধার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত পাঠাও রাইড চালক মো: শামীম বেপারী ওরফে বাবু (২৮)হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

সোমবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে র‌্যাব-১, উত্তরা, একটি আভিযানিক দল রাজধানীর আশুলিয়া থানাধীন জামগড়াস্থ রুপায়ন মাঠ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আটক করে।

এবিষয়ে আজ সোমবার দুপুর দেড়টায় রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১) এর কার্যালয়ে র‌্যাবের পক্ষ থেকে এক প্রেসব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এসময় র‌্যাব-১ এর এডিশনাল এসপি মো: কামাল উদ্দিন, কোম্পানী কমান্ডার ও সহকারী পুলিশ সুপার মো: সালা উদ্দিন এবং সহকারী পুলিশ সুপার মোর্শেরুল হাসান সহ র‌্যাবের অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রেসব্রিফিংয়ে র‌্যাব-১ এর কমান্ডিং অফিসার (অধিনায়ক) লেফটেন্ট্যান্ট কর্ণেল শাফী উল্লাহ বুলবুল সাংবাদিকদেরকে বলেন, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়া থানাধীন কাঠগড়া পালোয়ান পাড়াস্থ মোল্লা বাড়ির বাঁশ ঝাড়ের ভিতর মোঃ শামীম বেপারী বাবু (২৮) নামে এক পাঠাও রাইড চালককে অজ্ঞাতনামা কতিপয় ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে এবং তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। এই চাঞ্জল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনায় ভিকটিমের পিতা মোঃ শাহিন বেপারী (৫৮) বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। যার মামলা নম্বর-৫২ তারিখ ১৫/০২/২০২০ ইং, ধারা ধারা- ৩০২/৩৯৪/২০১/৩৪ দঃ বিঃ।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এলিট ফোর্স র‌্যাব কাউকে ছাড় দিচেছনা। অপরাধ করে কেউ ছাড় পাবেনা। যেই অপরাধ করবে তাকে সেই অপরাধের শান্তি পেতেই হবে।

গত বছর ধৃত এই পেশাদার ছিনতাইকারী দলের সক্রিয় সদস্যরা তিনটি ছিনতাই করেছে বলে র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছে। তারা দীর্ঘ দিন ধরে অপরাধকর্মকান্ড করে আসলেও এর আগে এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা কখনও ধরা পড়েনি।

শাফী উল্লাহ বুলবুল সাংবাদিকদেরকে বলেন, নিহত মোঃ শামীম বেপারী বাবু রাজশাহী জেলার বাঘা থানাধীন চৌমুধিয়া গ্রামের মোঃ শাহিন বেপারীর একমাত্র পুত্র সন্তান। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বাকি চার বোন তার বড়। সে খিলগাঁও থানাধীন মেরাদিয়া মধ্যপাড়ায় তার স্ত্রীসহ বসবাস করত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেছিল। পরবর্তীতে সে নিজে একটি মোটরসাইকেল ক্রয় করে পাঠাও এ্যাপ এর মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনের কাজ করে আসছিল।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর রামপুরাস্থ ফরাজি হাসপাতালের সামনে থেকে একজন যাত্রী নিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় যাওয়ার কথা বলে মোটরসাইকেল নিয়ে পাঠও চালক শামীম বেপারী ওরফে বাবু তার বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর সে গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় ফিরে না আসায় তার পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে ভিকটিমের পরিবার টেলিভিশন সংবাদের মাধ্যমে হত্যার বিষয়টি জানতে পারলে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ সনাক্ত করে। চাঞ্জল্যকর এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটক করতে অভিযানে নামে র‌্যাব। পরবর্তীতে তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে র‌্যাব-১ এর একটি চৌকষ দল আজ সোমবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে অপরাধীদেরকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, তারা একটি সংঘবদ্ধ পেশাদার ও ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। তারা অন্যান্য ছিনাতাইকারীর ন্যায় টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি ছিনতাই করে না। তারা শুধুমাত্র মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি, অটোরিকশার মত ছোট যানবাহন ছিনতাই করে থাকে। ছিনতাইয়ের জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তারা সাধারণ যাত্রীবেশে আবার কখনো বিয়ের জন্য গাড়ি ভাড়া করার কথা বলে ছিনতাই করে থাকে। টার্গেট নির্ধারনের পর তাদের একজন যাত্রীবেশে চালককে নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যায়। যেখানে পূর্বে থেকে তাদের অন্যান্য সহযোগীরা ওৎ পেতে থাকে। এক্ষেত্রে যাত্রীবেশে থাকা তাদের সহযোগী গাড়িতে উঠানোর পর মোবাইল ফোনে কথা বলার ফাঁকে কৌশলে তার অবস্থান ও গন্তব্য চক্রের অন্যান্যদের জানিয়ে দেয়।

সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে লেফটেন্ট্যান্ট কর্ণেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, তারা দিনের বেলায় নামে মাত্র বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তারা ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী হয়ে উঠে। তারা অধিকাংশ সময় ছিনতাই শেষে ভিকটিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে যাতে নিরাপদে ফিরে যেতে পারে এবং পাল্টা আক্রমনের শিকার না হয়।

সাংবাদিতদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ভিকটিম মোঃ শামীম কে হত্যার পর আলমত ধ¡ংস করার উদ্দেশ্যে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ভেঙ্গে ফেলে এবং নিজেদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। এসময় আসামী মোঃ মাহবুবুর রহমান এর ব্যবহৃত জ্যাকেটে রক্ত লেগে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে খুলে ফেলে দেয় এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও ঘটনাস্থলে ফেলে দেয়। ভিকটিমকে হত্যার সময় ধস্তাধস্তির কারণে চাবি হারিয়ে যাওয়ায় ধৃত ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা ঘটনাস্থলের পার্শ্বে রাস্তার উপর মোটরসাইকেলটি ফেলে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় বলে জানায়।

এদিকে র‌্যাব কার্যালয়ে ধৃত ছিনতাইদের ছুরকাঘাতে নিহত মো: শামীম বেপারী বাবুর পিতা ও হত্যা মামলার বাদী মো: শাহীন বেপারী কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, আমার একমাত্র ছেলেকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকার ও প্রশাসনের কাছে আর কিছু চাইনা।

তিনি বলেন, মাত্র একটি মটরসাইকেলের জন্য যারা আমার পুত্র (জান) কে যারা হত্যা করেছে তাদের আমি ফাঁসি দাবী করছি। আমি আমার ছেলে হত্যাকারীদের সুষ্ঠ বিচার চাই। আর যেন এভাবে কারও বুক খালি না হয়। এসময় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

ধৃত ছিনতাইকারী মোঃ মামুনুর রশিদ জিজ্ঞাসাবাদে সে র‌্যাবকে জানান, সে পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী। সে প্রায় ৫ বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া সে দীর্ঘ দিন যাবৎ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। সে সংঘবদ্ব চক্রটির নেতৃত্ব দেয় বলে জানায়।

ঘটনার আগের দিন রাতে সে ভিকটিমের মোটরসাইকেলে করে গাবতলী থেকে আশুলিয়া যায় এবং তাকে টার্গেট করে। ঘটনার দিন বিকেল ৫টার দিকে সে আবার ভিকটিম পাঠাও চালক মো: শামীম বেপারী ওরফে বাবু (২৮) সাথে যোগাযোগ করে এবং তার মোটরসাইকেলযোগে গাবতলী এলাকা থেকে আশুলিয়ায় পৌঁছে দিতে বলে। পরবর্তীতে ঘটনার দিন দিবাগত রাত ৮টার দিকে শামীমকে নিয়ে গাবতলী হতে আশুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এরপর ওই রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সে ভিকটিমকে সিগারেট খাওয়ার কথা বলে থামায় এবং তাকে কৌশলে রাস্তার পার্শ্বে বাঁশ ঝাড়ে নিয়ে যায়। এসময় সেখানে পূর্বে থেকে ওৎ পেতে থাকা অপর আসামী মাহবুব ও মোমিন ভিকটিমের উপর আকষ্কিক ভাবে ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমন করে।

প্রাথমিক জিঞ্জাসাবাদে অপর ছিনতাইকারী সদস্য মোঃ মাহবুবুর রহমান র‌্যাবের কাছে স্বীকার করে যে, আশুলিয়া জামগড়া এলাকায় তার একটি চায়ের দোকান আছে। তার চায়ের দোকানে বসেই তারা সব ধরনের পরিকল্পনা করে থাকে। ঘটনার দিন ভিকটিমকে সে সর্ব প্রথম ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এসময় অপর আসামীরা ভিকটিমের হাত-পা চেপে ধরে এবং সে তার গলায় ছুরি চালায় বলে স্বীকার করেন।

এছাড়া তার সহযোগী মোঃ মোমিন মিয়া জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, সে পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী। সে প্রায় ১১ বছর ধরে আশুলিয়া এলাকায় বসবাস করে আসছিল। সে এই চক্রের হয়ে ছিনতাইকৃত গাড়ি বিক্রয়ের কাজ করে থাকে বলে জানায়। ছোট ছোট কাজের সুবিধার জন্য তারা তাদের সদস্য সংখ্যা তিন জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে ছিনতাই সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড করে আসছিল বলে জানায়।

জিঞ্জাসাবাদ শেষে গ্রেফতারকৃত তিন ছিনতাইকারীকে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করা হবে। এবিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

লাইভ প্রেস২৪/ এস, এম, মনির হোসেন জীবন/এমএসএম

Share This: