৩ মাস ধরে শিকলে বন্দি মানসিক প্রতিবন্ধি ফাহিমা


লাইভ প্রেস২৪, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বুরুজের পাড় গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী মানসিক প্রতিবন্ধি ফাহিমার ৩ মাস ধরে শিকল বন্ধি অবস্থায় রয়েছ। ফাহিমা বুরুজের পার গ্রামের মৃত নুরুজ্জামান এর মেয়ে।
ফাহিমা মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন। একসময় সবার সাথে হাসি খেলেই জীবন চলত সবার সাথে। সবার মতো যেত স্কুলে । স্কুলের বন্ধুবান্ধবীর সাথেই ২০০২ সালে অংশগ্রহন করে এসএসসি পরিক্ষায় । ভাল ফল করে সে। হঠাৎ বাবা নুরুজ্জামান পার‌্যালাইসিস এ আক্রান্ত হয়। শুরু হয় অভাব। তখন সংসার বাচাতে ফাহিমা পাড়ি জমায় ঢাকায়। চাকরি পায় গার্মেন্টসে। কিন্তু পড়া লেখার টান তাকে সবসময় টানত। তারপর সে ভর্তি হয় ইন্টারমেডিয়েট এ পরিক্ষার ফরম পুরন করে ফাইনাল পরিক্ষায় অংশ নেয় । পরিক্ষার মাঝেই তাকে কোন এক কারনে বহিঃস্কার করা হয়। তখন থেকেই ভেঙ্গে পরেন ফাহিমা । কোন এক গভীর রাতে কি যেন ভেবে হঠাৎ চিৎকার করে উঠে ফাহিমা। তখনি সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ীর ভিতরে খুটির সাথে লোহার শিকলে বাধা ফাহিমা। শিকলের শেষ অংশে ঝুলছে তালা। পায়ের সঙ্গে লাগানো লোহার শিকলই সারাদিনের সঙ্গি ফাহিমার। শিকলের আঘাতে এখন পায়ে পরেছে ক্ষত চিহ্ন । সারাদিন ঝড় রোদ বৃষ্টি যাই হোক না কেন সারাদিন শিকল অবস্থাই খাকতে হয় ফাহিমাকে। দিন শেষে শুয়ে পরার সময়ও শিকল পরে না পা থেকে তার । শিকল নিয়েই ঘুমাতে যেতে হয় তাকে। মা বাসায় না থাকলে থাকলে সারাদিন বাসায় বা যেখানে বেধে রেখে যাওয়া হয় সেখানেই শুয়ে বসে থাকতে হয় না খেয়েই।
ফাহিমার মা রাবেয়া বেগম জানায়, তার মেয়েটি এখন মানসিক প্রতিবন্ধি । সবসময় কথা বলতেই থাকে । নিজেই নিজের হাত পা কামড়ায়,শরীর থেকে জামা কাপড় খুলে ফেলে দেয় । সুযোগ পেলেই বাসা থেকে পালিয়ে যায়। কয়েকদিন আগেও সে বাসা থেকে পালিয়ে গেছিলো । অনেক কষ্টে খোজাখুজির পর তাকে পাওয়া যায়। সবাইকে মারতে যায়। তাই তাকে শিকলে বন্ধি করে রাখা হয়। অর্থেও অভাব থাকলেও অনেক চেষ্টা করছেন চিকিৎসার । স্থানীয় মানসিক চিকিৎসক আমজাদ এর কাছে ১ বছর চিকিঃসা করান। পরে টাকা না থাকায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠান। সেখানেও টাকার অভাবে তাকে রাখেতে পারেননি। আবার তাকে ফেরত নিয়ে আসা হয়। এখন অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা সম্পুর্ন বন্ধ।
নদীগর্ভে বিলীন সর্বহারা পরিবার কাঁচকোল বুরুজের পাড়গ্রামে গিয়ে দেখা যায় চারিদিকে খড়ের বেড়া বেষ্টিত ভিতরে ছোট্ট একটা টিনের চালায় বসবাস ফাহিমার । ৮ বোনের সংসার ফাহিমার। ছোট বেলায় ফাহিমা বাবাকে হারায় পরিবার থেকে। তখন থেকে মা রাবেয়া বেগম মেয়েদের নিয়ে পরে যায় মহাবিপদে । ফাহিমার বড় বোনেরা অভাবের কারনে খেতে পারেন না তিনবেলা । খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ফাহিমার বোনেরা চলে যায় ঢাকাতে। সেখানে গার্মেন্টস এ চাকরি করে যা টাকা আসে তাতে তারাই খেয়ে পরে বাচেঁ এবং কিছু টাকা বারিতে পাঠায় । কোনমতেই সেই টাকা বাচিয়ে রাবেয়া বেগম একে একে সব ৬ মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। পওে সংসার থেকে সবাই যখন চলে যায় তখন থমকে যায় তার সংসার। এখন ফাহিমার সংসার চলে ৬৫ বছর বৃদ্ধা মায়ের সামান্য বিধবা ভাতা ও ফাহিমার প্রতিবন্ধি ভাতা দিয়ে ।

ফাহিমার ছোট বোন ফিরদোসি বেগম জানান, ফাহিমা আপা খুব মেধাবি ছিলেন। সব বুজতেন তিনি। সংসরের ভাল না চলার কারনে এসএসসি পরিক্ষার পরে ঢাকায় যান এবং চাকরি করে । তারপর এইচএসসি পরিক্ষা দেয়ার জন্য বারিতে আসে । পরিক্ষার মাঝে তাকে স্ফেল করার কারনে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরে তিনি। তখন থেকেই এখ ন পর্যন্ত আর স্বাভাবিক জীবনে ফিওে আসে নি।

প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ফাহিমা আগের মত আর নাই, সবসময় আবোল তাবোল বলে থাকে। যেকোন সময় পাড়ার যে কোন কাউকে আঘাত করার চেষ্টা করে তাই তাকে শিকলে বন্দি করে রাখে তার মা।

ফাহিমার মায়ের দাবি সমাজের বিত্তবানরা বা সরকারী সহযোগিতা পেলে তাকে উন্নত চিকিৎসা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

লাইভ প্রেস২৪/জেডআই

Share This: