‘আব্বুর কবরে একমুঠো মাটিও দিতে পারলাম না’

লাইভ প্রেস২৪,ঢাকা: নাম মুনাফ আলী। বয়স ৬৭ বছর। থাকতেন রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে। আগে থেকে তাঁর শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। গত কয়েক দিন ধরে শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যায়। পিতার এমন অবস্থা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান ছেলে নূর মোহাম্মদ সাগর। বুধবার সকালে প্রথমে বাবা মুনাফ আলীকে নিয়ে যান উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। এরপর সেখান থেকে সকাল ৯টায় নিয়ে আসেন কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে। যে হাসপাতালটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সরকার নির্ধারিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। সকাল ১০ টায় মুনাফ আলীকে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির দেড় ঘণ্টা পর হাসপাতালে মারা যান মুনাফ আলী।

মুনাফের একমাত্র ছেলে নূর মোহাম্মদ সাগর বলেন, ‘আমার আব্বু আমারই চোখের সামনে মারা গেছেন ঠিক ১১ টা ৪৪ মিনিটে। হাসপাতাল থেকে আমাদের বিকেল ৫টার সময় আসতে বলা হয়। আমি হাসপাতালে আসি বিকেল ৫ টা ২০ মিনিটে। ততক্ষণে আমার আব্বুর লাশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাফনের জন্য অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেছে।

নূর মোহাম্দ বলেন, ‘আমার জানামতে, আব্বুর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না। কারণ আমার আব্বুর জ্বর ছিল না, ছিল না ঠান্ডা কিংবা গলাব্যথা। তবে আমার আব্বুর শ্বাসকষ্ট ছিল অনেক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের না জানিয়ে আব্বুর লাশ খিলগাঁওয়ে কবরে দাফন করেছে। নূর মোহাম্মদ সাগর বলেন, ‘আমার আব্বুর মুখখানা আমি দেখতেও পারিনি। আমার পরিবারের কেউই আব্বুকে শেষ দেখা দেখতেও পারে নাই। আব্বুর কবরে এক একমুঠো মাটি দিবো, তাও দিতে পারলাম না। এক মুঠো মাটি দেওয়ার সুযোগও পেলাম না।

কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে গতকাল মারা যাওয়া মুনাফ আলী পেশায় ছিলেন কাঠ ব্যবসায়ী। মূলত গজারি কাঠের ব্যবসা করতেন। তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে মারা গেছেন। বেঁচে আছেন ছোট ছেলে নূর মোহাম্মদ সাগর। মুনাফ তাঁর ছেলের সঙ্গে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

মুনাফ আলীর ছেলে নূর মোহাম্মাদের অভিযোগ, তাঁদের না জানিয়ে লাশ খিলগাঁওয়ে কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মুনাফের ছেলে নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার আব্বুকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সামনে নিয়ে আসি। এরপর হাসপাতালের সামনের দেয়ালে লেখা মোবাইল নম্বরে ফোন দিই। তখন একজন নারী নার্স ফোন ধরেন। আমাকে বলেন, ‘আমরা শ্বাসকষ্টের কোনো রোগী ঢোকাই না। ভর্তি করি না। হাসপাতালের ওই নারী সেবিকার এমন কথা শোনার পর অ্যাম্বুলেন্সে পড়ে ছিলেন মুনাফ আলী। নূর মোহাম্মদ যখন তাঁর বাবাকে নিয়ে চলে যাবেন, তখন হাসপাতালের ভেতর থেকে একজন পুরুষ বেরিয়ে আসেন।

নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা যখন কুয়েত মৈত্রীর সামনে থেকে চলে যাব, তখন একটা লোক হাসপাতালের সামনে আসেন। আমার আব্বুকে তখন হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আধা ঘণ্টা পর আমার আব্বুকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। আব্বু তখন পানি খেতে চাইছিলেন। আমি তখন হাসপাতালের বাইরে থেকে পানি কিনে আনি। আব্বুকে পানি খাওয়ানো হয়। আমার আব্বুর তখন শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। আব্বু আমাকে ইশারায় বলেছিল, ‘বাবা, আমার ভালো লাগছে না। তখন আব্বুকে বলি, ‘আব্বু অক্সিজেন একটু মুখে লাগিয়ে রাখেন, ডাক্তার যেহেতু আসছেন। তখন আমি ডাক্তারকে ডাকি। কিছুক্ষণ পর আবার আব্বুর মুখ থেকে অক্সিজেন খোলা হয়। আব্বু আবার পানি খান। পরে আব্বু অস্থির হয়ে পড়েন। নিজেই অক্সিজেন দেওয়ার যন্ত্রপাতি ছিঁড়ে ফেলেন। একটু পরেই আমার আব্বুর জানটা বের হয়ে যায়। তখন একজন নার্স আব্বুর কাছে আসেন। তিনি ইনজেকশন দিতে চাইছিলেন। আমি তখন বলি, আমার আব্বু তো মারা গেছেন।

নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘আব্বু মারা যাওয়ার পর হাসপাতালের লোকজন বলেন, তোমরা ১০ মিনিট অপেক্ষা করো। সেই ১০ মিনিট দুপুর ২ টায়ও শেষ হয় না। দুপুর ২টার সময় আমার চাচাতো ভাইয়েরা হাসপাতালে আসেন। তখন হাসপাতাল থেকে আমাদের বলা হয়, বিকেল ৫টায় আসতে। লাশ নিতে একদিন কিংবা দুই দিনও লাগতে পারে। আবার এক ঘণ্টাও হয়ে যেতে পারে। আমি মনে করলাম, বিকেল ৫ টার সময় যদি আব্বুর লাশ দেয়, এ জন্য বাসায় চলে যাই। আমি আবার ফিরে আসি বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে। হাসপাতালের লোকজন আমাকে বলে, আব্বুর লাশ বিকেল ৫টায় দাফনের জন্য বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমাকে নাকি তাঁরা ফোন করেছিলেন। আমি কিন্তু ফোন পাইনি।

মৃত্যুর সনদপত্র নেওয়ার জন্য আজ বৃহস্পতিবার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে আসেন নূর মোহাম্মদ। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আব্বু মারা যাওয়ার পর নমুনা নেওয়া হয়েছে। আমি কিন্তু এখনো জানি না, আমার আব্বু কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। হাসপাতাল আমাকে এখনো জানাইনি। আমরা হাসপাতালে এসেছিলাম, বাবার লাশটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। এটা কি আমার অপরাধ? আমাদের তো আত্মীয়স্বজন আছে। শেষ দেখা বলে একটা ব্যাপার আছে। আব্বুকে শেষ দেখা কেউ দেখতে পেল না। আমাদের এভাবে হয়রানি করা ঠিক নয়। এটা তো সরকারি হাসপাতাল।

মুনাফ আলীর মৃত্যু নিয়ে নূর মোহাম্মদের অভিযোগের ব্যাপারে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। হাসপাতালটির প্রশাসনিক ভবনের সামনে দায়িত্বে থাকা আনসার এস কে মাহবুব ও হাসমত আলীর মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন, হাসপাতালের ভেতর সাংবাদিক প্রবেশ নিষিদ্ধ। কেউ কোনো বক্তব্য দেবেন না।

লাইভ প্রেস২৪/বিএইচ